View Sidebar
কায়সার হকের নির্বাচিত কবিতা

কায়সার হকের নির্বাচিত কবিতা

October 30, 2014 5:28 pm

নির্বাচিত কবিতা

কায়সার হক
অনুবাদ ও সম্পাদনা : অপ্রতিম রাজীব

 

জানালা (Windows)

‘দেখো!
এই দালানগুলো ভূত জাহাজের মতো
ঘনায়মান অন্ধকারে।’

‘হ্যাঁ, কিন্তু আবার দেখো,
আলো প্রত্যাবৃত,
জনমানুষ চারদিকে।’

‘তবু তারা দেখতে এতো দূরবর্তী, এতো অচেনা,
জানালার মানুষগুলো
ঠিক কার্ডবোর্ড কাট-আউটের মতো।’

‘সত্য, আর এখনো
প্রিয়তমা, ওই আয়ত বিকীর্ণ আলোই
আমাদের বাড়ি…’

‘…ভঙ্গুর স্লেটগুলো
যার উপর কিনা আবছাভাবে আঁকবো আমরা
আমাদের শিথিল চুম্বন।’

 

এ টু জেড, আজাদ (A to Z, Azad)

(হুমায়ূন আজাদকে)

কিছু একটা মরে যাচ্ছে আমাদের ভেতর
আর হতচকিতার সাথে আমরা তা দেখছি;

এটা ছিল সম্ভাব্য সেরা সারবত্তা
আমাদের, আর তা আমাদের বেদনাকর সব ত্রুটি সত্ত্বেও
এখনও মানুষ বলে চিহ্নিত করে যাচ্ছিল :

আমরা ভেবেছি এ পৃথিবী
কিংবা অন্তঃত আমাদের এ প্রান্তটুকু
হতে পারতো
যদি ভালো না হয়
অন্তঃত কম মন্দ,
কিন্তু এটি কেবল খারাপই হচ্ছে ক্রমাগত –
দেখা যাচ্ছে আমরা তা হয়েছি ইতোমধ্যেই।

সত্য, আমরা একটি যুদ্ধে জিতেছিলাম –
কিংবা অন্তঃত একটি বিজয় দিবস তো জিতেছি
কিন্তু আমরা যা জিতেছি তার চেয়ে
যুদ্ধে হয়েছি বিপন্ন যা আমাদের ক্রুদ্ধ করে আজ
প্রতিনিয়ত।
যখন
বাঁচা ও বাঁচতে দেয়া
কসাইয়ের ছুরিকাঘাতে খন্ড খন্ড
একটি দর্শন
চিন্তারত মন নিশ্চয়ই পুনরাবৃত্তি করবে
সে সকল শক্তির সামনে
যারা কিনা
সেসব শক্তিতে রূপ নিতে বেপরোয়া
সভ্যতার জন্য কিছু সরল শিক্ষা হবে যারা :

ব্যালট-বাক্সের গণতন্ত্র অর্থহীন
নমোতন্ত্র ছাড়া (দয়া করে
এই শব্দটি খুঁজুন
একটি অভিধানে –
আমি ভীত যে আপনার এজন্য একটি
বড়সড় অভিধানই লাগবে)

কোনো জগৎ নেই একথা বলা
কিন্তু আমরা শব্দ দিয়ে যা করি নির্মাণ
আর যাকে আমরা সত্য বলি
তা কেবলই একটি নির্মিতি
হতে পারে মজার
অধুনান্তিক ফ্যাশান
লক্ষ্য একাডেমিক আস্বাদন
কিন্তু শব্দ দিয়ে অসত্য নির্মাণ
মিথ্যাচার ছাড়া কিছু নয়

আর ঈশ্বরের নামকে
রাজনীতির নোংরা নর্দমায় নামানো
আগাগোড়া পাপ
অথবা দানবীয় পাগলামি

আজাদ হওয়া, মুক্ত হওয়া
হাঁটতে, বলতে, লিখতে, গাইতে,
ভালোবাসতে, আঁকতে, নাচতে
– এগুলোই জীবনের এ হতে জেড,
বাকি সব মৃত্যু
মৃত্যু
মৃত্যু
মৃত্যু
মৃত্যু

আমি চলতে পারি ক্রমাগত
কিন্তু কেন স্কুল-মাস্টারের মতো?
আমি রেনে মাগ্রিতে থেকে একটি সূত্র নিতে পারি
আর
মাত্রার নির্দেশ
আর অসংবদ্ধ ছন্দ সত্ত্বেও
লিখতে পারি :
Ceci n’est pas un poeme
এর পরিবর্তে
আমি কিছু শব্দ স্বীকরণ করবো
সেম্বার খালে শহীদ
বিষণ্ণ উইলফ্রিড ওয়েন থেকে,
যাঁর আত্মা এখনও তাড়ায় সাক্ষরদের :

এখানে আমার চিন্তা কবিতা নিয়ে নয়।
আমার বিষয় জীবন, আর প্রতিবাদ
জীবনের শত্রুদের বিরুদ্ধে।
কবিতা সেই প্রতিবাদের অংশ।

(দ্রষ্টব্য : হুমায়ূন আজাদ, যিনি ইসলামী জঙ্গিদের আক্রমণ করে একটি ব্যঙ্গরচনা লিখেছিলেন, বই মেলা ত্যাগ করার সময় বর্বরভাবে আক্রান্ত হন। তিনি প্রায় অলৌকিকভাবে বেঁচে যান, কিন্তু এঘটনার কয়েক মাস পরই হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান।)

 

অন্ধকার সূর্যের প্রভু (Lord of a Dark Sun)

(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিনে তাঁর স্মৃতিতে লেখা কবিতা)

হোয়াট’স ইন অ্যা নেইম?

অনেক কিছুই থাকতে পারে
একটি নামের ভেতর।
একটি নাম নিন যাতে বোঝায়
সূর্যের প্রভু :
আপনি কি এটাকে
নিটোল গোলাপের মতো
সহজে উপেক্ষা করবেন?
আর এর ধারক কি এটিকে
একটি মজার প্রতিশব্দের আড়ালে
লুকিয়ে রাখতে পারেন,
যা আপনি করেছিলেন,
পিতামহ-কবি,
ব্যঙ্গ-রচয়িতার ব্যঙ্গের মতো
যা কিনা সঠিক প্রযোজ্য এভাবে :
একজন কাল্পনিক লেখকের ওপর
টিউটোনিক গাম্ভীর্যের
একটি ডক্টোরাল অভিসন্দর্ভ!
অবশ্যই আপনি সে’রকম ব্যঙ্গ থেকে
যে কারও মতো মুক্ত ছিলেন –
আপনার দ্বিতীয় প্রকৃতির শিশুসুলভ ক্রীড়া,
অনেকটা আপনার নৌকার মতো
আকাশের বুকে লুকোচুরি খেলে
মেঘেদের সাথে, স্বর্গীয়
আলো আঁধারের খেলা দিয়ে মরণশীল চোখকে চমকিত করে।
প্রতিটি দুঃখময় ও মিষ্টি
অনুভূতির খেয়াল নিয়ে
আপনার একেকটি গান ও নৃত্যের রুটিন।
আর যদি একথাটা পরিহাসাত্মক হয়
তাহলে আমাকে একটু কর্কশ হতে দিন :
অনেক সময়ই আপনার গদ্য
মাদাম ব্লাভাস্কির মতো করে পড়ে নেয়া যায়।
প্রাদেশিক সংস্কৃতি-শকুন
আর নবযুগের ছদ্ম-
বহুজাতিকরা
আপনাকে ওরকম হিসেবে রাখবে।
কিন্তু যখনই আমাদের নষ্ট পচা যুগ
আপনার কলমকে
একজন দ্বিধাগ্রস্ত শিল্পীর অস্ত্র বানিয়ে
আপনার অবিনশ্বর দর্শনকে ছুঁতে যায়,
যখন আপনি বাঁকা তলোয়ার দিয়ে
পালের ধর্মের গরুর মাংস কাটার মতো
কেটে কেটে শব্দভান্ডার বানান,
তখনই আপনি রয়ে যান
আমাদের নিঃশেষিত সহস্রাব্দের
একজন প্রেরণাদাতা,
সূর্যের প্রভু,
এক অন্ধকার সূর্যের প্রভু।

 

হে ক্লিও (O Clio)

ইতিহাস যদি
দুঃস্বপ্ন হয়
তাহলে আমাকে ঘুমোতে দাও –
অন্তঃতপক্ষে এটি অপ্রকৃত

 

বাংলাদেশ’৭১ (Bangladesh’71)

অবশেষে ঝুঁকি নিয়ে বের হয়ে
আমি চোখের পাপ মিটিমিটি দেখি
আর গলা বরাবর হাতড়িয়ে
কাল্পনিক একটি টাই খুঁজি।

ভীতির মতোই ঝরে ধোঁয়াটে গোধূলি
মানব-হৃদয় আর পাথরের ওপর।
কীভাবে আর কী দিয়ে কেউ করবে শিল্পের নির্মাণ?
ধোঁয়া, মৃত্যু, তারপর ছাই করে আগুনকে বেষ্টন।

মৃতদের রক্ত আমাদের ঘুমে দেয় দাগ,
প্রশ্নচিহ্ণের মতো কলম কাগজে ঝুলে থাকে,
হাতড়ানো আঙ্গুল অন্বিষ্ট মাংস খুঁজে পায় না আর,
বাষ্প আমার প্রেম, কিন্তু আমার চোখে অশ্রু নেই কোনো।
ভোর কম্পন তোলে ইঁদুরের মতো; দরজায় শুনি কার করাঘাত?
সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্ট, ১৯৭২

 

প্রেম (Love Is)

দুই আঙ্গুলে
যোগের অঙ্কের মতো
সরল

কম্পিউটারের
বাইনারী হিসেবের মতো
জটিল

 

তিনটি ক্ষুদ্র মনোসিলেবিক মুক্ত ছন্দের কবিতা (Three Minimalist Poems in Monosyllabic Vers Libre)

১. একটি ছোট্ট ধর্মমত (A Minimalist Credo)

কমই
বেশি

বেশি
কিংবা
কম

২. স্থিরচিত্র (Snapshot)

বলো
পনীর!

কিন্তু
তোমার
হাসিটি
কঠিন

ঠিক
একটি
ব্যাঙের
নিতম্বের
মতো

৩. আলোকায়ন / নির্বাণ (Illumination/Nirvana)

তুমি
দেখো
আলো

এবং
হঠাৎ

শুরু
কর
বাঁচতে

এখানে
এবং
এখন

 

পর্দা (Purdah)

সুরমা দেয়া চোখ
আশেপাশে চেয়ে দেখে
বরফ-ঠান্ডা বীয়ার
পান করতে করতে।

 

সান্ত্বনা (Consolation)

কোনো কঠোর সূর্য নয়, এক তরল আকাশ
অশ্রুর প্রান্তে, আর শুধু
গাছেদের গোঙানি –
আমরা এ জগতের চেয়ে অদৃষ্টবান!

 

দুর্গাপূজা (Durga Puja)

বৃষ্টির পর বন্যা কমে যায়
আকাশ উন্মোচিত হয় এক বিশাল নীল প্যারাস্যুটের মতো,
আর মা দুর্গা পৃথিবীতে হাজির হন
তাঁর দশ হাত নিয়ে বার্ষিক বকেয়া সংগ্রহের তাগিদে।

বেনিয়ারা তাঁকে সুন্দরী প্রতিযোগিতায় নিয়ে যায়,
বাবুদের মুখে ঋণগ্রস্ততার ভাঁজ পড়ে,
ললনারা শঙ্কিত হয়ে ওঠে ভক্ত ও সুধীজনদের জন্য
মিষ্টি ভাজতে ভাজতে,
আর বামুনেরা অবচেতনার মাঝে মন্ত্র পড়তে পড়তে।

কিন্তু যেখানে উৎসব এর নাম পায়, সানাই আর ঢোল
বাধাহীন বাতিকে পর্যবসিত, কিশোরেরা একটু সময়ের জন্য
কিশোরীদের বিরক্তির কারণ হয়ে ওঠে
ঔদ্ধত্যের সঙ্গে, আর প্রতি বছরই নতুন নতুন শিশু
নির্লিপ্ত দেবীর অপরিবর্তনীয় হাসি নিয়ে খেলা করতে থাকে।

 

বর্ষার কবিতা : গদ্য-পুনশ্চের সঙ্গে (Monsoon Poem With Prose Postscript)

এমন কি বিরাট ছাপও
আলোর প্রবাহে হয় ম্লান।
কেউ একজন নরকের কথা ভাবতে পারে –
বস্তি-ঘরে ভরা এক বিরাট নগরী –
প্রজ্জ্বলিত, কালির মতো কালো হওয়া
ধোঁয়ার মেঘ,
বর্ষা আসার হাবভাব
নির্ণীয়মান।

তুমি নিজে একটি বাঁশের কুটির খুঁজে নাও –
কাদার মেঝে, টিনের ছাদ –
আর অপেক্ষা কর যেভাবে বাষ্পার্দ্র বাতাস
তোমাকে পেঁচানো কাগজের মতো মুড়ে রাখে।

এটি আসে :
একটি ফোঁটা
টিনের ছাদের উপর –
ধারালো!

আর আরও,
টাট্টুকে হার মানানো,
ধুলোকে পর্যুদস্ত করা
একটি হুঙ্কার ছাড়ার উদ্দেশ্যে;
মনে হয় নিচের মাটি
গুলে যেতে পারতো
চিনির স্তুপ যেমন গুলে যায় চায়ের মধ্যে।

বুদ্ধ বলেন : ‘সবকিছুই ক্ষণস্থায়ী, আর অসংলগ্ন’- আর তাঁর অনুগতরা বৃষ্টির অঝোর ধারা না কমা পর্যন্ত তাঁর শিক্ষানুযায়ী ধ্যান করবে বলে বিহারে ভিড় করতো। আমারও ইচ্ছে ধ্যান করি কিন্তু আমাকে একটি পার্টিতে যেতে হবে – যেখানে বর্ষার সৌন্দর্যের ওপর অর্থহীন বাক্যালাপ হবে – আমাদের দেশের পক্ষে যা বেমানান আর এ’ বিষয়ের ওপর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্বর্গীয় গীতি আমাকে প্রাণ-চঞ্চল করার জন্য যথেষ্ট। আমার বর্ষার চিন্তা এখন বন্যার জল ফোলে-ফেঁপে ওঠে মহাপ্লাবনে পর্যবসিত হওয়া ক্ষতিকর নর্দমা, যা কিনা আমাদের চিরকালের ধুলোবালি দূর করার নিমিত্ত।

 

এগারোটি জরুরি সতর্কবার্তা (Eleven Serious Warnings)

(হাফিজ ও নিসারকে)

প্রেমে পড়ো না
প্রেম তলাহীন
তুমি একেবারে ঘৃণা ক্ষোভ হতাশার মাঝে
কিংবা আরও খারাপ কিছু
বিবাহের মতো কিছুর মাঝে
পড়ে যাবে

ঘৃণা করো না
সেটা চারদিকে এখনই এতো বেশি আছে

প্রেম ও ঘৃণা থেকে পালিয়ে
সংসদীয় কার্যক্রমে
সূক্ষ্ম বিষয়ের ওপর বিতর্কে যেয়ো না
একটি অভ্যুত্থান তোমাকে বোকা বোকা বানাবে
তার সাথে
কিছূ ছোকরা সর্বক্ষণ বলছে
নৈর্ব্যক্তিক পরিস্থিতিই সঠিক
একটি বিপ্লবের জন্য
যদি বা তাদের কথা ঠিক হয়

কখনো গভীর রাতে
বিপ্লব ঘটাতে যেয়ো না
এমন কি পৃথিবীও পুরো একটি বছর নেয়
এক আবর্তনের জন্য

ঝাঁকুনি দিয়ে কথা বলো না
যা কিনা একটি আধুনিক
উপ-সামন্তিক উপ-ধনবাদী
অর্থনৈতিক ভারসাম্যের
করুণ ভগ্নদশা
যা ব্যাখ্যা দান করে হিংসা ও ক্ষুধার
আর রাজনৈতিক নড়াচড়ার
শিশুদের বিহ্বল চোখের
কোনো দেবতাই
আর কোনো ব্যাখ্যা চাইবে না

সহজে অস্তিত্ববাদ-এর মতো কোনো বইয়ে
প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যেয়ো না
জীবন তোমাকে ফেলের গ্রেড দেবে
কিংবা দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ নিজে নিজে শেখো-র মতো কোনো বই
তাহলে তুমি
কমিউনিস্টদের মুসলমানী বিয়েতে আমন্ত্রিত হবে

বা’ দিকে যেয়ো না
ডান দিক তোমার সাথে লড়াই করবে

ডান দিকে যেয়ো না
বাম চিৎকার করে বলবে
তুমি ভুল পথে যাচ্ছো

মাঝেও থেকো না
তুমি ক্রস-ফায়ারের মাঝে পড়বে

খুব বেশি ককটেইল পান করো না
তোমার উদ্বেগের মাঝে কিংবা একে যা খুশি বলতে চাও
মদ্য অগ্নি-উৎপাদক
তুমি হয়ে যাবে মলোটভ ককটেইল
আর যদি তা ছাড়া না চলে
ধূমপান করো না
কিংবা ধূমপায়ীর কাছে যেয়ো না
কিংবা তোমার স্ত্রীকে রান্নাঘরে বাঁচাতে যেয়ো না
(এই ক্ষেত্রে যে তুমি প্রথম সতর্কবাণী উপেক্ষা করলে আর একটি মানলে)
আর চূড়ান্তভাবে

এসবের কোনো সতর্কবার্তাকেই
গুরুত্বের সাথে নিয়ো না
কোনো ব্যাপার নয় তুমি কী কর না তাতে
তুমি যেমন আছো তেমনি থাকবে
স্নানরতার মতো
ঝুলন্ত
যা একজন প্রমিলা ভুলে গেছেন
বৃষ্টির মাঝে করতে

 

মিস বাণী সেন (ms bunny sen)

(জীবনানন্দ দাশ, ই. ই. কামিংস ও টি. এস. এলিয়টের আত্মার প্রতি ক্ষমা প্রার্থনাপূর্বক)

পায়ুকামীর মতো এই জঘন্য শহরে ঘুরে ঘুরে
ঈশ্বর জানেন কতোক্ষণ –
মনে হয় রক্তাক্ত হাজার বছর ধরে,
কোনো রহস্য নয়;
বনশালের তীব্র দুর্গন্ধময় রেস্তোরাঁ থেকে
গুলশানের বিষাক্ত লেইক পর্যন্ত
প্রতিটি জঘন্য ইঞ্চিতে আমি করেছি পদক্ষেপ
এবং পিচের মতো অন্ধকার রাতে
সাময়িক বিদ্যুৎহীনতায় ভালোভাবে।
আমি গিয়েছি বড় কাটরায়
ধূসর গোধূলিতে
আর সুদূর রায়েরবাজারে
চাঁদহীন অন্ধকারে,
আর সবকিছু যার জন্য
আমি সেই তোমাকে শুধাই –
কয়েকটি নোংরা টাকা
যার জন্য আমাকে চেঁচাতে হয়
নিজেই কর্কশ স্বরে
যাকে কিছুই শেখানো যায় না এমন এক
শ্যাম্পেইনের বুদবুদের মাঝে সাঁতার কাটা
আলালের ঘরের দুলালকে পড়িয়ে,
টের পাই আমি পুরোপুরি
নিঃশেষিত, আমি তোমাকে বলছি,
কখনোই চলতো না
যদি কিছুক্ষণের জন্য না হতো সাক্ষাৎ
বাংলামোটরের
মিস বাণী সেনের সাথে।

ওহ্ চুল তার সংসদ ভবনের ওপরকার
অন্ধকার আকাশের মতো
আর মুখ তার ঠিক যেন
ঐশ্বর্য রাইয়ের।
মনে কর ভাঙা জাহাজের ওপর শায়িত
কোনো এক নাবিক
যে হঠাৎ
দামী মসলার গন্ধ নিয়ে
একটি সবুজ দ্বীপের ওপর এসেছে –
এমনটাই আমি ভেবেছি যখন সে এসেছিল
আর টেবিলে বসেছিল
ডিম লাইটের আলোয় উজ্জ্বল ফাস্ট ফুডের দোকানে,
(শ্যানেল থেকে)
তীব্র আকর্ষক
কস্তুরীর ঘ্রাণ ছড়িয়ে;
কী খবর? সে বললো
অপ্রতিম পাখির নীড়ের মতো
অনিন্দ্যসুন্দর চোখদুটো তুলে –
সেগুলোর ভেতর
আমি শুধু পারতাম পায়ের উপর পা তুলে বসতে
আর আনন্দের সাথে
মরতে।

যখন দিনের পাট চুকে যায়
অন্ধকার এগোয় চুপিসারে
নিরব শিশিরের মতো;
শকুনেরা নোংরা ডানা থেকে
মুছে ফেলে রৌদ্রের ঘ্রাণ;
সবকিছু থেকে রঙ মুছে যায়;
দূরবর্তী পাড়াগাঁয়
মিটমিট জ্বলা জোনাকীরা ঘোষণা করে যে
এটা গল্প শেষের ঘন্টা;
জ্যাম হওয়া ড্রয়ার থেকে
কাগজ-কলম গুটানোর ক্ষণ;
আর আমার প্রতিদিনকার
সৃষ্টিশীল রচনার কাল –
যদিও ঈশ্বর একাই জানেন
কোন নোংরা সমাপ্তির দিকে।
পাখিরা ফিরে আসে নীড়ের উদ্দেশে,
রক্তাক্ত নদীর শেষ সীমানায় যেখানে তারা শুরু করেছিল পরিক্রমা,
জীবনের চলাচল ও বেচাকেনা
চিরকাল চলতে পারে না; সবটাই
অন্ধকার, অন্ধকার, অন্ধকার
কিন্তু তার সবই
বাংলামোটরের মিস বাণী সেনের সাথে
দু’জনে মিলে কথা বলার জন্য।

 

আজব আনন্দ (Strange Pleasures)

বেলাল চৌধুরীকে

শেষবার যখন আমরা দীর্ঘায়ত
করেছি রাজনৈতিক গোলমাল (যা কিনা
সাইক্লোনের মতো কিংবা
শান্তির দেশে উৎসবের মতো নিয়মিত)
কেউ কিছু জানতো না
তাদের উষ্মার ঊর্ধ্বে
কিংবা হতাশার, বিপণীগুলো ছিল
অর্ধেক বন্ধ, বাসগুলো গিয়েছিল অর্ধেক পথ,
নিরুদ্যম অভ্যুত্থান মাঝপথে স্থগিত,
শান্তিকর্মীদের ব্যবসা
উঠে গেল, বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয়
নেমে গেল, আর কেউ হিসেবই রাখলো না
মর্গে পাঠানো লাশগুলোর।

তবুও বরাত ভালো, ফোনগুলো ছিল কার্যক্ষম,
আড্ডায় ছিল ব্যস্ত।
এক বন্ধু রিং করে জানালো
কীভাবে লোকজন ততোক্ষণ সচেষ্ট
জীবন অতিবাহনে, ঘরের
ভেতরে-বাইরে : এক লোক চাইলো
তার কান থেকে ময়লা ঝাড়তে, আরেকজন
যে কিনা জীবন কাটাতো
এমন ফরমায়েশ পূরণ করে,
কাজে লেগে গেল।
মক্কেল মহোদয় বসলো একটি টুলের উপরে
চৌরাস্তার কাছে একটি পায়ে চলা পথে,
চোখগুলো আধবোজা ধ্যানের ভেতরে;
অন্যজনকে দেখালো লক্ষ্যভেদীর মতো
দাঁড়িয়ে আছে একটি সরু লোহার রড হাতে –
তার মনোযোগের ওপর নির্ভর করে
আনন্দ ও স্বাস্থ্য কিংবা ব্যথা ও সংক্রমণ।
অল্প দূরেই বিক্ষিপ্ত কিছু গুলির শব্দ শোনা গেল :
একটি ঢুকলো বসা লোকটির কান দিয়ে,
অন্য কান দিয়ে বেরিয়ে এলো, ঢুকলো
কান-পরিষ্কারকের চোখে, চিরকালের মতো
তার গাঢ় মনঃসংযোগ শেষ করে।

যেভাবে ফোনগুলো আমাদের অট্টহাসিতে কেঁপে উঠেছিল :
রাজনীতি অদ্ভূত সব মজার যোগান দেয়।
কিন্তু আমাকে বলতে হচ্ছে
আমার তথ্যদাতা ছিলেন এক কবি
আর সবাই জানে, কবিদের আর যাই হোক,
সর্বাংশে বিশ্বাস করা যায় না।

 

নবীনের অপ্রেরিত প্রেমপত্র (A Freshman’s Unsent Billex-Doux)

তোমার দীর্ঘ ঊরুর তাপ
আমার ঊরুতে।

কী ছিল এটা? বসন্ত নাকি অর্ধ-মাতাল
গ্রীষ্মমন্ডলীয় শীত? যা হোক

কোনো ম্লান মেঘ ছিল না
একমাত্র উপমায় ছাড়া :
সদা-হাজির বজ্র-উদর আর আলোকছটার অঙ্গযুক্ত
রাজনীতির দানব।

আনন্দময় আকাশ তখন, নীল ও উজ্জ্বল
প্রোজ্জ্বল পিপুল পাতার মাঝে দৃশ্যমান
উদ্বিগ্ন প্রেমিকদের টস করা
এতো সব মুদ্রার মতো :
হেডে সে আমাকে ভালোবাসে, টেইলে……..
ছোট্ট হাসি ফুটে উঠতো তোমার ঠোঁটে
আর ফুটপাথে
এক ফুল-বিক্রেতার বালতি উপচে পড়তো
সুরম্য রজনীগন্ধায়, বন্ধুপ্রতিম গাঁদায়,
মরমী-প্রেমিক গোলাপে।

এখন সব ফুলই তোমাকে মনে করিয়ে দেয়।
এটাই আমার হতাশা :

এতো ফুল
আর শুধু একজন তুমি

আর কেবল একটিবার
প্রিয় মুহূর্ত আমাকে
তোমার সাথে ভাগাভাগি করে নিতে দিয়েছিল
একেবারে সংক্ষিপ্ত এক রিকশা-ভ্রমণ

তোমার দীর্ঘ ঊরুর তাপ
আমার ঊরুতে।

 

সম্মতি (Hitting It Off)

তুমি বলেছিলে
এ বিদীর্ণ হৃদয় আমার
আবার লাগাবে জোড়া।

সেই কথা রেখে
কাটালে তোমার জীবন।

তোমার কথার
সুচ ও সুতোর
গভীর হানায়,
খন্ড খন্ড অংশগুলোর জোড়াতালিতে।

 

বিশ্বসৃষ্টি (Cosmogony)

(ঋগবেদের নসদীয় রাগের ওপর)

শুরুতে
কোনো অস্তিত্ব, অনস্তিত্ব ছিল না,
কোনো মহাশূন্য, উপরে কোনো আকাশ,
কোনো মৃত্যু, কোনো অমরতা,
কোনো দিন, কোনো রাত…….
(কী নরক!)

কোনো বায়ু, কোনো ঝড়ো হাওয়া ছিল না,
তবু কোনো কিছু নিশ্বাস নিয়েছিল :
এছাড়া আর কিছু ছিল না……
(কী নোংরা!)

অন্ধকার অন্ধকারকে আবৃত করলো।
এই সবই ছিল জল।
উত্তাপ জাগিয়ে তুললো জীবনের অভিঘাত।
আকাঙ্ক্ষা এলো : মনের প্রথম বীজ……
(বাজনা!)

কবিসংঘ তাদের হৃদয়ের ভেতর ঘুরঘুর করলো
আর নিরস্তিত্বের মাঝে অস্তিত্বকে পেয়ে গেল……
(ভগবান!)

সেখানে উপরে কী ছিল?
শক্তি। বীজ-বপনকারীরা।
সেখানে কী ছিল নিচে?
আবেগ…….
(আর খেয়াল?)

কিন্তু কেউ সত্যি সত্যি জানে না,
হয়তো এ সবই স্বনির্মিত।
যদি কোনো স্বর্গীয় দেবতা নিচে চেয়ে থাকেন
সর্বোচ্চ চূড়া হতে
তিনি জানতে পারেন।
কিংবা নাও পারেন।

কী আপদ?
এসো আমরা ধাঁধাগুলো একত্র করি।

 

রাত (Night Is)

একটি বেড়াল
যে ধীরস্বরে বিড়বিড় করে
আর হয়ে ওঠে মোটা

এক হিজড়া
যে ব্যঙ্গ করে হাসে
গুপ্ত প্রেমিক আর
নৈশপ্রহরীর দিকে

একটি কর্কশ কাক
যে পথ বদলায়
কর্দমাক্ত আকাশের ভেতর

এই দিন
আঁঠাকে অবজ্ঞা করা
খন্ড খন্ড মুহূর্ত

কাঁচা রাতে
যে কিনা গলির ওপর করেছে শাসন
সেই বেড়ালকে তাড়া করা
গর্জনরত কুকুর

সেই কুকুর
দ্রুত ঘুমে মগ্ন –
নিশ্বাসের বৃত্তাকার স্তুপ
দরজার মুখে

এক জোড়া
খালি জুতো
একটি ইতিহীন
হাই

প্রলম্বিত
একটি মিথ্যে ভোর

 

আর কোনো একদিন (Anon)

পরিস্থিতি যাই হোক
তার থেকে মুক্তি নেই

যেকোনো সংকলনের পাতা উলটাও
গদ্য বা পদ্য বা আরও খারাপ কিছুর
যেকোনো শতাব্দী থেকে
আমাদের নিজ শতাব্দীতে,
সেখানে সে আছে

যখনই তার কাছে যাই
ইচ্ছে করে, নামহীন হই

 

অপবিত্র পুণ্যদিন (Unholy Sabbath)

নদী সাপের মতো কুন্ডলি পাকায়
আর নিজের কাছে প্রার্থনা করে

গাছেরা থামিয়েছে
পাতা থেকে খাদ্য শোষণ

সূর্য আমাদের বালিশ ভেজে
গরম ইট বানায়

তোমার মনের গ্রামে
একমাত্র বিপণীটি বন্ধ

 

আত্মপ্রেম (Self-Love)

প্রত্যেক রাত বিগত রাতের মতো :
নৈশভোজের শর্করা আমার মুখে ;
আমি প্রগাঢ় ঘুমে অচেতন

কিন্তু জেগে ওঠলাম ফের
অন্ধকারের গভীরে।

আমার মুখের ভেতরের দেয়ালগুলো
নতুন পৌর নর্দমার
জ্যামিতিকভাবে শক্ত পার্শ্বগুলোর মতো
কিন্তু আমার অ-ইউক্লিডীয় জিভ
এদের স্বাদ ঠিক একইভাবে নিলো।

 

বাড়ির জন্য চিঠি (Writing Home)

সুমিকে

একশো একরের এই জমিতে
যা কিনা স্বর্গের মতো মনে হয়
সকল পাখির মধ্যে আমার কান
ঘুঘু আর কাকেদের প্রতি
যাদের ডাকাডাকি
ঠিক স্বদেশের মতো

মনে পড়ে রিকশার ঘন্টির পাগলামি

চোখ বন্ধ করি
আর মনে মনে কল্পনা করি ওজন
আমার উদরের ওপর রাখা তোমার মাথার।

                                                হথর্ণডেন কেল্লা, স্কটল্যান্ড, জুন ২০০০

 

প্রগতিবাদের ওপর আন্তর্জাতিক সম্মেলনে পঠিত মনোসিলেবিক মুক্ত ছন্দের জেন কবিতা (Zen Poem in Monosyllabic Free Verse Presented at International Conference on Meliorism)

জিল ও জন ক্যারিকে

আমার
যা
কিছু
বলার
আছে
তা
এই :

শ!

 

উৎপাত (Disturbance)

অলীক দুনিয়ায় বাসরত
যোগী
তাঁর স্বভাবের বিপরীতে

গাল ফুলিয়ে
বাঁশি বাজান
আর ধোঁয়া টানেন

একটি লাল
পিপড়ে
যে তার কামড় নিয়ে গর্বিত
তাঁর দিকে ক্রমধাবমান

 

অন্ধকার (Darkness)

আলমগীরকে

টিভিতে খবরের সময়
সশব্দে বিদ্যুৎ চলে যায়

যদি এমন হয় যে আজ কোনো খবর নেই
শুধু একটি কণ্ঠস্বর

ক্রমাগত বলছে
আর বলছে

সবই ভালো
দয়া করে বাড়ির বাইরে যাবেন না

 

ক্ষণস্থায়ী (Ephemera)

প্রথম সকালের কুল,
টক :
এদের ওপরে শিশিরের মতো টাটকা লালা

মেঘ যাদের নাম আমি বলতে পারি না –
অলকমেঘ? ঘনমেঘ? –
বিকেলের বাতাসের রঙ দাও

মসজিদের বাইরে ভিক্ষুকেরা :
হামাগুড়ির সার্কাস

পারদের মতো উপরে উঠছে জল
একজন টাইফয়েড রোগীর জিভের নিচে

আমার জিহ্বায় চা
রাস্তার কাদার মতোই ঘন

অথবা আমি কি ভিন্নভাবে স্থানবদল ঘটাবো সেই দৃশ্যগুলোর মধ্যে?

অকালে নষ্ট জীবনের ক্ষণস্থায়ী মুহূর্ত

 

লুঙ্গির ওপর ওড্ (Ode on the Lungi)

(বেবি ও শওকত ওসমানকে)

দাদা ওয়াল্ট, আমাকে আমার ভাবনা ভাগ করে নেয়ার অনুমতি দিন
আপনার সাথে, কেবল যখনই প্রতিবার
আমি “Passage to India” পড়ি আর সেই
“passage to more than India” বাক্যাংশগুলোর সংস্পর্শে আসি
আমি কল্পনা করি, সেকেলে লোকের মতো, যে আপনি চেয়েছিলেন
লক্ষ্যের অতিরিক্ত ছুঁড়তে
বাংলাদেশের ভূখন্ড ও
ছায়ার সীমারেখা পেরিয়ে

ইদানিং আমি খুব ভাবছি
পোশাকের সমতা নিয়ে
আমরা কতো না দূরে আছি
এই গণতান্ত্রিক আদর্শ থেকে!
আর কী ভন্ডামি!
“সকল পোশাকের সম অধিকার আছে” –
কেউ একথা অস্বীকার করবে না
আর এখনও কিছু নিশ্চিতভাবে বেশি সমান
অন্য সবকিছুর চেয়ে
না, আমি জ্যাকেট আর টাই নিয়ে
অভিযোগ করছি না
যেগুলো কোথাও কোথাও দরকারী –
কাল্পনিক পোশাকী দলের মতো,
ক্রীড়াময় আনন্দের অংশ

আমি আরও মৌল কিছু বিষয়ের কথা বলছি

শত শত মিলিয়ন লোক
পূর্ব আফ্রিকা থেকে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত
লুঙ্গি পরে, যেটি বিভিন্নভাবে পরিচিত
সারং, মুন্দা, হামাইন, শারাম,
মাওয়াইস, কিতেং, কাঙ্গা, কাইকি
দিনের পর দিন তারা এটি পরে
ঘরে বাইরে
কেবল ভাবুন –
যেকোনো মুহূর্তে
লুঙ্গি পরিহিত লোক আছে এ দুনিয়ায়
মার্কিন মুল্লুকের জনসংখ্যার চেয়ে বেশি
এখন চেষ্টা করুন একটি পরতে
হোয়াইট হাউজের যেকোনো অনুষ্ঠানে –
এমনকি আপনিও, দাদা ওয়াল্ট,
গণতন্ত্রের বরপুত্র,
এটি পরবেন না,
আপনি পরতেন যদি
পেতেন একটি কিল্ট –
কিন্তু লুঙ্গি? কখনোই না।
কিন্তু কেন? – এটা সেই প্রশ্ন
যা আমি সকলকে ভাবতে বলি

এটা কি সভ্যতাগুলোর সংঘর্ষ?
এর স্পষ্ট অযৌক্তিকতা হলো –
কিল্ট “আমাদের”
কিন্তু লুঙ্গি “তাদের”!

নব্য-ঔপনিবেশিকতার কথাও ভাবুন
আর পোশাকী বৈষম্যের কথা,
কীভাবে বাদামী আর হলুদ সাহেবরা
পরিপাটী স্যূট গায়ে নাক কুঁচকায়
মার্জিত লুঙ্গি পরিহিত
স্বজাতীয়দের দিকে (এমনকি আত্মীয়পরিজনেরও দিকে) :
ব্যতিক্রম শুধু রীতিনীতিতেই প্রমাণিত,
যেমন – শ্রীলঙ্কা, যেখানে
রঙীন সারং হচ্ছে পার্টির পোশাক,
অথবা মিয়ানমার
যেখানে রাজনৈতিক হর্তাকর্তারা
লুঙ্গি পরে সারিবদ্ধ হয়
বিশিষ্ট অতিথিদের বরণ করতে
কিন্তু তখন, মিয়ানমার বেতের পর্দার আড়ালে
তন্দ্রায় ঢুলে,
এক অর্ধ-অস্পৃশ্য জাতি
বিশ্বায়নের আগ পর্যন্ত
অপেক্ষা করে :
সারি সারি সেভিন যেদিন ফলাবে
ক্রেতাদের এক রাশ তাজা ফসল

ব্যক্তিগত ব্যাপারেও বৈষম্য
একইভাবে : আমেরিকায় আমার কাজিন
কর্মক্ষেত্র থেকে বাড়ি ফিরে
লুঙ্গি পরতো –
যতোদিন না তার ছেলে
বাবার জন্য লজ্জা পেয়ে লুকাতে লাগলো
“ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর সেই কিম্ভূতকিমাকার বস্ত্রটিকে”

পুরোটাই হতাশাজনক
কিন্তু আমি এটা সেখানে ছেড়ে দেবো না
পরিস্থিতি বেপরোয়া
কিছু একটা করতে হবে
আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি
এটা ছেড়ে না দেয়ার
পরবর্তীতে কেউ যদি এমন মত দেয়
যে আমি অলীক জগতে বাস করি
আমি সগর্বে ঘোষণা করবো
আমি একজন লুঙ্গি কর্মী !
বন্ধু ও সহযাত্রী লুঙ্গি প্রেমীরা,
চলুন আমরা লুঙ্গির জন্য পার্টি ও প্যারেইড আয়োজন করি,
হলমার্ক ও আর্চির সমর্থন চাই
একটি আন্তর্জাতিক লুঙ্গি দিবস চালু করতে
যেদিন জাতিসংঘ প্রধান একটি লুঙ্গি পরে
বিশ্ববাসীর উদ্দেশে ভাষণ দেবেন

দাদা ওয়াল্ট, আমি লুঙ্গি পরা উদযাপন করি
আর লুঙ্গি নিয়ে গান গাই
আর আমি যা পরি
আপনিও তা পরবেন
এখন সময় যে আপনি চূড়ান্তভাবে আসবেন
ভারতের চেয়ে বরং বাংলাদেশে
আর আলস্যে লুঙ্গি পরে
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের একটি কুটিরে বসে
(আমরা সগর্বে বলি যে এটি পৃথিবীর দীর্ঘতম)
দেখবেন ২৮ জন তরুণ লুঙ্গি পরে সাগরে স্নান করছে

কিন্তু এটি কী
(জ্ঞানী বন্ধুরা আমার,
আমি ব্যু ব্রুমেলের দিকে ইঙ্গিত করছি)
আমি আবার বলছি, কী এই জিনিস
যা নিয়ে আমি বলেই চলেছি?
একটি আয়তাকার কাপড়,
সাদা, রঙীন, চেক কিংবা প্লেইড,
যেনতেনভাবে ৪৫⨯৮০ ইঞ্চি,
পাশাপাশি অর্ধেক কাটা
আর টিউবাকৃতির করতে
সেলাই করা
আপনি এর ভেতরে ঢুকে পড়তে পারেন
আর ঢিলা বাঁধনে বাঁধতে পারেন
কোমরের চারপাশে –
একটি সাইজই সকলের লাগবে
আর ময়লা দূর করতে
ধরা যাক আপনার সিটে
আপনি এটাকে ঝাঁকাতে পারবেন

যখন আপনি এটা খুলে ফেলবেন
লুঙ্গিটিকে স্কার্ফের মতো ভাঁজ করে নেয়া যাবে

ব্যবহৃত হয়ে গেলেও এর ব্যবহার থাকবে –
বাসনের ন্যাকড়া কিংবা মেঝে মুছনি হিসেবে
অথবা কাঁথা কম্বলের উপকরণ হিসেবে

অথবা আপনি আপনার কল্পনাকে কাজে লাগাতে পারেন
“সবকিছুর তত্ত্বের” সুপারস্ট্রিংকে অলংকৃত করতে চেয়ে
(এই শিরোনামের বই
সম্মানিত স্টিফেন হকিংয়ের)
পোশাকের টিউবটি নিয়ে খেলতে চাইলে

মূল বিষয়ে ফিরি,
লুঙ্গি একটি বিস্তৃত ডুমুর-পাতা,
সাধারণ মানুষের
স্বতন্ত্র উদ্ভাবনা
বছরের বেশি সময়, যখন খালি গায়ে
ঠান্ডায়, আপনি সুন্দর দিন-যাপন করতে পারেন
কেবল এক জোড়া লুঙ্গি নিয়ে,
পুকুর বা নদীতে ডুব দিয়ে
অথবা লেংটিতে পর্যবসিত
লুঙ্গি পরে সাঁতার কেটে,
তারপর অন্যটি পরে
তপ্ত রোদে
একটি লুঙ্গি হতে পারে
আরব-ধাঁচের টুপি
অথবা শিখদের মতো পাগরী
শীতের হাওয়া এলে
বাড়তি লুঙ্গিটি হতে পারে
অপরিকল্পিত ক্লোক
কুস্তি করতে
কিংবা কাবাডি খেলতে
লেংটি হিসেবে লুঙ্গি পরা যায়
কিন্তু ফুটবল কিংবা ক্রিকেট মাঠে
অথবা বর্ষায় জলে হাঁটতে
এটাকে উপর-নিচ ভাঁজ করা হয়
আর হাঁটুতে ওঠানো হয়

সংক্ষেপে
লুঙ্গি হচ্ছে একটি সম্পূর্ণ পোশাক
আগ্রহী যে কারো জন্য :
সমতাবাদের মূর্ত প্রতীক,
হাসি-ঠাট্টার সাথে উচ্চারিত
বিশ্বব্যাপী বামপন্থীদের প্রতীক
একথা সাব-অল্ট্রান বলছে

এবং আরও :
যখন প্রেমের সময় আসে,
লুঙ্গি হতে পারে
দু’জনের ঘুমের জন্য একটি থলে :
একটি কবিতার বই, এক বোতল মদ
আর আপনার প্রিয়তমা আপনার লুঙ্গির ভেতর
সেখানে আপনার স্বর্গ

যদি ভাগ্যহানি ঘটে
আর যদি বর্ষা হয় বাইবেলের
মহাপ্লাবন
ঠিক জলে নেমে পড়ুন আর হাত-পাম্প দিয়ে
আপনার লুঙ্গিকে বেলুনের মতো ফোলান –
এটি এখন আপনার বাধ্য জাহাজ

যখন আপনি আশ্রয় খুঁজে পাবেন
একটি গাছের উপর
এটি খুলে ফেলবেন,
জলে ধোবেন,
উপরে তুলে ধরবেন –

আপনার অনমনীয়তার পতাকা –
আর তা অকেজো তারাদের দিকে নাড়াবেন

 

ঢাকার রাস্তায় প্রকাশিত (Published in the Streets of Dhaka)

(আশিস নন্দীকে)

সুন্দর বস্তু ১৮৭৫ সালের আগ পর্যন্ত বন্দিত হয়ে আসছিল যতদিন না ‘pretty-pretty’ শব্দগুচ্ছটি তৈরি হলো। সত্যিকারভাবে চতুর, দক্ষ, আর কৌশলীর ক্ষেত্রে সুন্দর বিশেষণটি নিন্দার্থে ব্যবহৃত হতো, যেমনটা তিরিশ বছর পূর্বে আমি আবিষ্কার করেছিলাম যখন ই. এম. ফরস্টার আমাকে কিংস কলেজের চারপাশ দেখাচ্ছিলেন। যখন আমরা বিখ্যাত গির্জাটির (বিশাল, অসাধারণ, একটু বেশি) কাছে গেলাম, আমি বললাম, ‘সুন্দর।’ ফরস্টার ভেবেছিলেন আমি গির্জাটির কথা বলছি যখন আসলে আমি একটু দূরের এক তরুণ প্রেমিক জুটির দিকে ইঙ্গিত করেছিলাম। একজন আপোষহীন নীতিবিদ ফরস্টার আমার ভীতিকর শব্দটি ব্যবহারের কথা প্রচার করলেন। ফিজ্রোভিয়ায় উক্ত আর ঢাকার রাস্তায় প্রকাশিত সেই কথা জেনে ফিলিস্টাইনদের কন্যারা উল্লাস করলো; খৎনা করেনি যারা তাদের কন্যারা জয়ীর ভাব দেখালো। সেই সময়ের জন্য আমার শক্তিশালী শিরস্ত্রাণটি তুচ্ছের মতো দূরে নিক্ষিপ্ত হলো।
গোর ভিদাল, “On Prettiness”, New Statesman, মার্চ ১৭, ১৯৭৮

 

সুন্দর, তাই না – নিশ্চিত তিনি আপনাকে
ঝামেলায় ফেলেছেন, মিস্টার মর্গান ফরস্টার
তার সুসভ্য বিনোদন সম্প্রচার করেন
রাজার এসসিআরে সিগ্রেট ও বন্দরের ওপর।

গল্পটি দ্রুত ছড়ায় – আর কেন নয়,
এটি মজার এক হাসির কথা – ফিজ্রোভিয়া,
গোঁফওয়ালা কবিরা যেখানে অর্থহীন বকবক করে
বাদাম চিবোয় আর সমান তালে আড্ডা দেয়।

কিন্তু সবটা পথই বর্ষা-পীড়িত ঢাকার দিকে?
সেটা বিস্তৃত পথ! আমার উচিত জানা,
আমি এখানে জন্মেছি আর এখানেই থাকি।
বাঁশ, বট আর আম গাছের নিচে
আপনার সুন্দর গল্প ছাপার প্রতীক্ষায় দোদুল্যমান
এ এক অলীকতার উচ্চতায় – এটাই কি আপনার যুক্তি নয়?

যুক্তি গৃহীত। এখন অনুমান করুন সেই ভীতি
ঢাকা থেকে আসা একজন লেখকের। হ্যাঁ, একজন লেখক,
কারণ হোমো স্ক্রিপ্টারের একটি স্থানীয় শাখা আছে, আপনি জানেন,
আর বাজারে বইবিক্রেতার এসব জিনিস
যেমন গীতিকবিতা ও বিচিত্র রসসাহিত্য
পরীক্ষার গাইড বইয়ের স্তূপ থেকে উঁকি দেয়
মরচে ধরা সুচের মতো – আমিও করেছি এজাতীয় কিছু অপরাধ।

কিন্তু আপনার উদ্যমহীন জনবল্লভতা ভালো পারিশ্রমিকই পেতে পারে
ঢাকার নগণ্য রাস্তায় প্রকাশিত
বই কিংবা পুস্তিকার পেছনে।
মোটের ওপর, মিস্টার গোর ভিদাল,
আপনি প্রায় ভিদাল সাসুনের মতোই
সুখ্যাত।

আপনার কথা আইন না হতে পারে
কিন্তু কিছু স্থানে তা সেটার কাছাকাছি এসে যায় –
সঙ্গতভাবে। অনৈতিকতাকে আক্রমণে
আপনি কখনোই অন্ধকারে ঢিল ছোঁড়েন না
কিংবা উদ্ধতের মতো করেন না তর্জন-গর্জন। আমার নীতিশাস্ত্রের গাছে
আপনি আছেন চমস্কি,
হোন্ডারিক, অরুন্ধতীর সাথে। এটাই আপনাকে নাক সিঁটকাতে দেয়
আরও বেশি রাগের সাথে। এখন,

আমাদের কী করতে হবে, মিস্টার ভিদাল?
লেখালেখি বন্ধ করবো, আর যদি তা করি, প্রকাশ করবো না?
একটি অভিবাসন লাইনে দাঁড়াবো, এই আশা করে যে
সাংস্কৃতিক সম্প্রসারণের প্রান্তমুখে চলে,
বহিরাগত বহুসাংস্কৃতিক জাদুঘরে প্রদর্শিত হবো?

কখনোই না। আমি এখানেই থাকবো, এই বর্ষা-পাগল বাংলার মাঝে
এঁটে, দেখবো
কাঁঠালপাতা ঝরে পড়ছে ভোরের বাতাসে
যে দৃশ্য আমার এক বিখ্যাত পূর্বসূরী দেখতেন

আর সেই সাথে দেখবো
চকচকে ছুরি, ঘূর্ণ্যমান লাঠি, বিস্ফোরিত বোমা,
আর সঙ্গী হবো ঘৃণার অস্ফূট কথা ও আওয়াজে,
আর অশুভ সত্তা যার কোনো অক্ষ প্রয়োজন নেই
সর্বত্র যাওয়ার ব্যাপারে –

আর এ সবেরই পথ খুঁজতে যদি হয়
আমার আঁকিবুকি আর মুদ্রণে
আমি এখানে সানন্দে একটি লাফ দেবো
কর্কটক্রান্তি রেখার ওপর, গর্ব অনুভব করবো
আরো একবার ঢাকার রাস্তায় প্রকাশিত হতে পেরে।

 

Printed Version:

Spread the love

Leave a reply


error: Content is protected !!